১৩ মে ২০২৬
preview
শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়ক প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে কোটি টাকার দুর্নীতি: থমকে আছে উন্নয়ন কাজ

বিএনএন ডেস্ক

শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নকশায় নেই এমন অস্তিত্বহীন স্থাপনার বিপরীতে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রকল্পের সব বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলেও অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৫১ শতাংশ।

প্রকল্প শুরুর ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ৩৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মাত্র ৬ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। মেয়াদ বারবার বাড়ানো সত্ত্বেও জটিলতায় প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। ইতিমধ্যে সব টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) নতুন করে ৪১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করতে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে অবৈধ স্থাপনার নামে ভুয়া ক্ষতিপূরণ প্রদান, ঘুষ বাণিজ্য এবং আইন অমান্য করেই অর্থ বিলি করার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদী জটিলতায় পড়েছে। ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৫.৮৫ হেক্টর জমি নেওয়ার কথা থাকলেও, অর্ধেক জমি অধিগ্রহণেই সব অর্থ ফুরিয়ে গেছে।

অতিরিক্ত ৪১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা

সওজ সূত্রমতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ২০০১ সালে চাঁদপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক সড়কটি চালু হয়। রাস্তাটি সরু ও চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় বিগত সরকার এটি প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৫ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণের জন্য ৮৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৩০ কোটি টাকা ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এবং ৪৩০ কোটি টাকা সড়ক নির্মাণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়।

প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হলেও কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ঠিকাদার জমি বুঝে না পাওয়ায় কাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে। এখনো প্রায় ৪৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ বাকি। সওজ এখন তৃতীয়বারের মতো সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে।

সওজের শরীয়তপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন জানান, ডিপিপিতে ভূমি অধিগ্রহণের বাজেট কম থাকায় টাকা দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। জমি বুঝিয়ে দিতে না পারায় ঠিকাদার কাজ করতে পারছেন না। এখন নতুন করে ৪১৫ কোটি টাকা চাওয়া হচ্ছে, যার ৩০০ কোটি টাকা জমি অধিগ্রহণে এবং ১১৫ কোটি টাকা নির্মাণে ব্যয় হবে।

অধিগ্রহণে ভুয়া বা 'ভুতুড়ে' ক্ষতিপূরণ

জমি অধিগ্রহণের জন্য নোটিশ দেওয়ার পর কিছু অসাধু চক্র তড়িঘড়ি করে ফাঁকা জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলে। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ওইসব অবৈধ স্থাপনার বিপরীতে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়া হয়। ভিডিও বা নকশায় নেই এমন স্থাপনার নামেও ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ছোট গাছকে বড় দেখিয়ে অস্বাভাবিক অংকের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে, অথচ এখন ওইসব স্থাপনা বা গাছ আর সেখানে নেই।

ভেদরগঞ্জের বালারবাজার এলাকায় শফিকুল ইসলাম নামের একজনের জমির ওপর অবস্থিত ছোট স্থাপনাকে দোতলা ভবন দেখিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বাড়তি বিল দেওয়ার নজির পাওয়া গেছে। আবার পাপরাইল এলাকায় জয়নাল খাঁর জমিতে থাকা কিছু গাছকে দুই শতাধিক গাছ দেখিয়ে ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ তৈরির অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগ ও এলএ শাখা এটি সরকারি নিয়মে হয়েছে বলে দাবি করলেও সরেজমিনে এর মিল পাওয়া যায়নি।

অবৈধ স্থাপনা দেখিয়ে অর্থ লোপাট

অধিগ্রহণ আইন ২০১৭ অনুযায়ী, সরকারি প্রকল্পের জন্য অসৎ উদ্দেশ্যে নির্মিত কোনো স্থাপনা ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু শরীয়তপুরের এই প্রকল্পে আইনের তোয়াক্কা না করে অবৈধ ঘরবাড়ির বিপরীতেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এমনকি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে করা আপিল নিষ্পত্তিতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

চরকাশাভোগ এলাকায় শাহিদা বেগম নামের এক নারী রাস্তার ক্ষতিপূরণ পেতে তড়িঘড়ি করে টিনশেড ঘর নির্মাণ করেন। প্রথমে এলএ শাখা তা বাদ দিলেও পরে আপিল শুনানির মাধ্যমে তাকে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অথচ বর্তমানে সেখানে সেই ঘরগুলোর কোনো চিহ্নই নেই। স্থানীয়দের দাবি, টাকা পাওয়ার পর স্থাপনাগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

টাকা পাওয়ার পর স্থাপনা হাওয়া

দক্ষিণ মধ্যপাড়ায় চান শরিফ মোল্লাকে তার জমিতে থাকা স্থাপনার বিপরীতে ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দেওয়া হলেও বর্তমানে সেখানে কোনো স্থাপনা নেই। একইভাবে মোস্তফা সরদার ৪৪ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেলেও সেখানে এখন বসিয়েছেন এলপিজি পাম্প। তার দাবি, ক্ষতিপূরণের পর তারা সরকারি স্থাপনাগুলো কিনে সরিয়ে ফেলেছেন, যা আইনত প্রশ্নবিদ্ধ।

ক্ষতিপূরণ পেতেও গুনতে হয় ঘুষ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের চেক পেতে এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়েছে। মনোয়ারা বেগম ও তার স্বামী আবদুল মালেক অভিযোগ করেন, ১৬ লাখ টাকা উত্তোলনের জন্য তাদের আড়াই লাখ টাকা দিতে হয়েছে। এছাড়া নান্নু সরদার নামের আরেক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন যে, ভ্যাটের নামে এলএ শাখার লোকজন তার কাছ থেকে ৬ শতাংশ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে এলএ শাখার সার্ভেয়ার আবু তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাসুদুল আলম এ বিষয়ে কোনো দায় নিতে রাজি হননি। জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম জানান, অনিয়মের কোনো অভিযোগ তিনি পাননি এবং কেউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

জেলা প্রশাসক দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এলএ শাখা ঢেলে সাজিয়েছেন। অন্যদিকে, সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন দাবি করেছেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষতিপূরণের কোনো অনিয়মের তথ্য তার কাছে নেই, তবে বিষয়টি তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন।


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com